রচনাঃ উৎপল দত্ত
নির্দেশনাঃ ড. প্রণবানন্দ চক্রবর্ত্তী

১৯৭১ সাল, ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে স্বাধীনতাকামি নিরস্ত্র বাঙালীদের ওপর বর্বর পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কাপুরোষিত হামলা ও গণহত্যার পর সবেমাত্র বাঙালী ছাত্র-যুবক, কৃষক, শ্রমিক ও আপামর জনতা প্রতিরোধ শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধুর আগাম নির্দেশনা মাথায় রেখে যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করছে। অন্যদিকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানী দখলদার সেনাবাহিনী সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে কামান, মেশিনগান আর ট্যাংক নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপর। ছোট ছোট শহরেও ঢুকে পড়েছে তারা, নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে। প্রথম প্রতিরোধে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে বাঙালী ছাত্র-যুবক, কৃষক শ্রমিক, জনতা, সম্ভ্রম হারিয়েছে নারীরা। ধীরে ধীরে আবার সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। একটি ছোট শহর তারাগঞ্জ, মূলতঃ শিল্পাঞ্চল। সেখানেও দাপিয়ে বেড়াচ্ছে পাকিস্তানী হানাদার সৈন্যরা। সেখানে একটি ছোট রেস্টুরেন্ট চালান একসময়ের কারখানা শ্রমিক বৃদ্ধা রশিদা খাতুন, যাকে সবাই ‘নানী’ বলে ডাকে। রশিদা খাতুনের ‘সুতৃপ্তি রেস্টুরেন্টে’ নিয়মিত খেতে আসে শ্রমিক, মালিক, বিভিন্ন অফিসের কর্মচারী, ধনী-গরিব নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার লোকজন। কারন রশিদা খাতুনের হাতে বানানো লুচি-শব্জি আর চায়ের কদর। তবে ২৫ মার্চের পর থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হামলা আর নিয়মিত টহলের কারণে লোকজন আগের মতো রেস্টুরেন্টে খেতে আসে না। এই রশিদার সাথে যোগাযোগ রয়েছে শিল্পাঞ্চলের গেরিলাদের। তিনি রেস্টুরেন্ট খোলা রেখে মূলতঃ তার আড়ালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তথ্য আদান-প্রদানে সহযোগিতা করেন। শ্রমিক নেতা মকবুলের তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর জন্য গোলা-বারুদভর্তি একটি ট্রেন এসেছে তারাগঞ্জ ষ্টেশনে, যাবে জামালপুর, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার জন্য। তারাগঞ্জের গেরিলারা এ ট্রেনটি উড়িয়ে দিতে চায় বোমা মেরে। সেজন্য চাই ডিনামাইট, যা পাওয়া যাবে মির্জাপুরের একটি ঠিকানায়। সেই ঠিকানাটি রশিদার কাছে আসবে লোক মারফত সাংকেতিকভাবে, যা গেরিলারা সংগ্রহ করবে।

‘ঠিকানা’ নাটকের দৃশ্য

সেদিন সন্ধ্যার ঘটনা। রেস্টুরেন্টে তখন খাচ্ছিলেন শিল্পপতি সাহাবুদ্দিন চৌধুরী সাথে তার বন্ধু মনস্তত্ত্ববিদ ডাক্তার আনিসুজ্জামান। আর ছিলেন যামিনী সেন- একজন যাত্রা-শিল্পী ও তার বন্ধু হাশমৎ আলী- ব্যাংকের কেরানী। হঠাৎ করে চা খাওয়ার জন্য রেস্টুরেন্টে ঢোকে টহলরত একদল সৈন্য, যার মধ্যে রয়েছে লেফটেন্যান্ট বোখারী, যিনি একজন বেলুচ। অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে তিনি অনবরত বমি করছিলেন আর তার পাঞ্জাবী সহকর্মীদের গালাগালি করছিলেন, মাঝে মধ্যে কাঁদছিলেনও। তিনি হঠাৎ প্রশ্রাব করতে চাইলে রশিদা খাতুন তাকে দোকানের পেছনে নদীর পাড়ে দিয়ে আসেন। কিন্তু প্রস্রাব করতে গিয়ে আর ফিরে আসে না বোখারী, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়না। খবর দেয়া হয় পাকিস্তানী কমান্ডার কর্নেল ওয়ালীউল্লাহকে। গ্রেফতার করে সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় রেস্টুরেন্টে উপস্থিত চারজন খদ্দের আর রশিদা খাতুনকে। তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্য লেঃ বোখারীকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়, চলে জেরা আর টর্চার। ঘোষণা প্রচার করা হয়, বোখারীর হত্যাকারী আত্মসমর্পন না করলে বা হত্যাকারীকে এলাকাবাসী ধরিয়ে না দিলে পাঁচজন বন্দীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে, ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে।

এর মধ্যে বোখারীর লাশ পাওয়া যায় নদীর চরে। জানা যায়, তাকে হত্যা করা হয়নি, তিনি আত্মহত্যা করেছেন, কারন তিনি এক বাঙালী নারী শাহেদার প্রেমে পড়েছিলেন, যার প্রেমিক ছিলেন ছাত্রনেতা কায়ফি, যাকে হত্যা করেছে পাকিস্তানী আর্মি প্রথম ক্র্যাকডাউনে। কলেজে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলো ছাত্ররা কায়ফীর নেতৃত্বে। শাহেদাও ছিলেন সে প্রতিরোধে, তিনিও আহত হন। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায় অবশ্য ওই বোখারী, যিনি প্রেমে পড়েন শাহেদার এবং তার প্রেমানুভূতি লাভে কায়ফি বেঁচে আছে বলে মিথ্যা কথা বলেন শাহেদার কাছে। পুরোপুরি সুস্থ হয়ে শাহেদা সব জানতে পারে, আর ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে বোখারীকে। যার ফলে বোখারী আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সব সত্য জানা সত্ত্বেও কর্নেল ওয়ালী পাঁচজন বন্দীকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন, আর সত্য গোপন করে কাপুরুষ বোখারীকে ‘বীর’ হিসেবে সর্বোচ্চ খেতাব দেয়া হয়। বন্দীদের নিয়ে চলে কর্নেল ওয়ালী’র নিষ্ঠুর, বিকৃত মানসিকতা প্রসূত নোংরা খেলা। ডাক্তার আনিসুজ্জামান সহঃবন্ধীদের মনস্তত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন নির্ভিক আর অসীম সাহসী রশিদা খাতুনকে, নির্মম অত্যাচার সহ্য করেও যিনি মুক্তিযোদ্ধাদের কথা প্রকাশ করেননি। আবিষ্কার করেন আপোষ, স্বার্থপরতা আর বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক হিসেবে সাহাবুদ্দিন চৌধুরীকে, যিনি রশিদাকে ফাঁসিয়ে নিজে বাঁচতে চেয়েছিলেন। তুলে ধরেন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিম্নস্তরের মানসিক অবস্থার কথা, যারা অনবরত বাঙালীদের ভয়ে ভীত। কিন্তু তাঁর মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় ধরা পড়েনা একজন আত্মচেতনায় বলীয়ান ‘হিরো’ যামিনী সেন, যিনি অন্যদের বাঁচাতে বোখারী হত্যার মিথ্যা দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, শত অত্যাচারও রশিদার মনোবল ভাঙতে পারেনা। তিনি কৌশলে মির্জাপুরের ঠিকানা পৌঁছান মকবুলদের কাছে। ২৫ এপ্রিল ১৯৭১ ভোর ছ’টায় ৫জনকে একে একে গুলি করে হত্যা করে পাক হানাদার বাহিনী। সবশেষে যে মুহুর্তে হত্যা করে রশিদা খাতুনকে, ঠিক সেই মুহূর্তে ষ্টেশনে গোলাবারুদভর্তি ট্রেনটিতে বিষ্ফোরন ঘটায় গেরিলারা। বিস্ফোরনের শব্দে দিগবিদিক কেঁপে ওঠে, কেঁপে ওঠে কর্নেল ওয়ালীসহ পাকিস্তানী সেনাদের অন্তরাত্মা। মৃত্যুর আগে বিষ্ফোরনের শব্দ শুনে যেতে পেরে পরম তৃপ্তিতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে রশিদা খাতুনের মুখ, জয় বাংলা বলে শরীরে লুকিয়ে রাখা বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা পাতাকাটি তুলে ধরেন তিনি।

গ্যাল্যারি